ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট লিগগুলোর ইতিহাসে সেরা অধিনায়ক মাশরাফি

আজ আমরা জানাবোফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের সফলতম অধিনায়কদের গল্প। তবে এর আগে বলে রাখি, এই তুলনামূলক পরিসংখ্যানটি তৈরি করা হয়েছে সেরা পাঁচ ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোর উপর ভিত্তি করে। এক্ষেত্রে প্রথমে বিবেচনায় আনা হয়েছে – কোন অধিনায়ক ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টগুলোয় তাঁর দলকে সবচেয়ে বেশি শিরোপা এনে দিয়েছেন। তারপর এসেছে ম্যাচ জয়ের শতকরা হারের প্রসঙ্গ। তাহলে চলুন, শুরু করা যাক।

প্রতিবেদনটা যখন লিখবো লিখবো করছিলাম, তখন হঠাৎ করে আমার এক বন্ধু মেসেজ করে বসল, ‘ভাই, এতো অপারেশনের পরও মাশরাফি খেলছে কিভাবে? আমার তো একবার পায়ের মাংসপেশিতে টান লাগার পর এক সপ্তাহ ঠিকমতো হাঁটাচলাও করতে পারিনি।’ আশেপাশের ক্রিকেট আড্ডায় কান পাতলে এমন প্রশ্ন অবশ্য প্রায়ই শোনা যায়। তাই যেই মানুষটি ১৩টি ইনজুরির ধকল সামনে একটি দেশের জাতীয় পতাকাকে বিশ্বমঞ্চে গর্বের সঙ্গে মেলে ধরতে পারেন, অবাধ্য পা যাঁর এগিয়ে চলাকে আটকাতে পারে না, তিনি যদি ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের সফলতম অধিনায়কে পরিণত হন, তবে তাতে অবাক হওয়ার মতো কোনোকিছু নেই। এরপরও যদি কারো মনে সন্দেহ থেকে থাকে, সেটাও এখন দূর করে দিচ্ছি।

বিপিএলের সাত আসরের প্রতিটিতেই কোনো না কোনো দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ‘ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক’ মাশরাফি। যেখানে ঢাকাকে দুইবার এবং কুমিল্লা ও রংপুরকে একবার করে শিরোপার স্বাদ পাইয়ে দিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে ভিন্ন ভিন্ন আসরে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো মোট ৮৬টি ম্যাচ খেলেছে। এরমধ্যে ৩২টি ম্যাচে হারলেও, জয়ের দেখা পেয়েছেন বাকি ৫৪টি ম্যাচেই। শতকরা জয়ের হার ৬২.৭৯ শতাংশ। তবে বিপিএলের বাইরে অন্য কোনো লিগে কখনো নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পাননি তিনি।

অন্যদিকে ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় লিগ আইপিএলেও মোট সাতটি আসরে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সকে নেতৃত্ব দিয়ে চারবার শিরোপা জিতিয়েছেন ভারতীয় ক্রিকেটার রোহিত শর্মা। তবে ১০৪ ম্যাচে দলকে নেতৃত্ব দেওয়া রোহিত শর্মা গড় ম্যাচ জয়ের দিক থেকে মাশরাফির তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে রয়েছেন। ৪২টি ম্যাচে পরাজয়ের পাশাপাশি ২টিতে ড্র করা রোহিত শর্মার ম্যাচ জয়ের শতকরা হার ৫৭.৭৮ শতাংশ।

ধোনিকে টপকে গেলেন তাঁর আরেক বন্ধু!

সেই ২০১১ সাল থেকে আইপিএলে একই দলে খেলছেন ক্যারিবিয়ান তারকা ডোয়াইন ব্রাভো ও ভারতীয় কিংবদন্তি অধিনায়ক মাহেন্দ্র সিং ধোনি। মাঝখানে ফিক্সিংকান্ডের শিকার হয়ে আইপিএলের নবম ও দশম আসরে একসঙ্গে ড্রেসিংরুম ভাগাভাগির সুযোগ না মিললেও, দুই তারকার বন্ধুত্বে কখনো ছেদ পড়েনি। এই তো কয়েকদিন আগেও বন্ধু ধোনির জন্মদিনে তাঁকে নিয়ে গানও গেয়েছেন ব্রাভো। তাছাড়া আর দশজন বন্ধুদের মতো তাঁদের মাঝেও বেশকিছু ব্যাপারে মিল দেখা যায়। এই যেমন, নিজ দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে তাঁরা উভয়েই দলকে নেতৃত্ব দিয়ে জিতিয়েছেন তিনটি করে শিরোপা।

কিন্তু, ঐ যে বলেছিলাম, শতকরার হিসাবের সূক্ষ্ম ব্যবধানে অবস্থানে একটু উনিশ-বিশ হবে। সেজন্য বন্ধু ধোনিকে টপকে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট লিগগুলোর তৃতীয় সেরা অধিনায়কের আসনে উঠে এসেছেন ৬২.৫০ শতাংশ ক্ষেত্রেই সফলতা পাওয়া ‘চ্যাম্পিয়ন’ ব্রাভো।

তবে আইপিএলের শুরু থেকে প্রায় প্রতিটি ম্যাচে দলকে নেতৃত্ব দেওয়া মাহেন্দ্র সিং ধোনি ব্রাভোর তুলনায় অনেক বেশি ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আবার তাঁর নেতৃত্বে খেলা ১৭৪টি ম্যাচের মধ্যে ১০৪টিতেই শেষ হাসি হেসেছে তাঁর দল। তাই জয়ের শতকরা হারের দিক থেকে আইপিএলে নেতৃত্ব দেওয়া অন্য যেকোনো অধিনায়কের তুলনায় ঢের এগিয়ে থাকবেন ধোনি। উল্লেখ্য, প্রতি ম্যাচে ধোনির জয়ের সম্ভাবনা শতকরা ৬১.৮৮ শতাংশ।

তিন লিগে তাঁরা তিনজন

একমাত্র মাশরাফি ব্যতীত বিপিএলের অন্য কোনো অধিনায়কেরই একাধিক শিরোপা নেই। এদিকে ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টের জগতে পিএসএল তো রীতিমতো ‘কচি বাচ্চা’! মাত্র চারটি মৌসুম পার করে পঞ্চমটিতে পা রেখেছে তারা। সেটিও আবার করোনার কারণে সেমিফাইনাল পর্বের আগেই বাতিল হয়ে গেছে। তাই তাদের কোনো অধিনায়কের কপালে এখনো একাধিক ট্রফি না জুটাই স্বাভাবিক। এবার বাকি রইল আইপিএল, সিপিএল এবং বিগ ব্যাশ। আর এই তিন লিগের তিন অধিনায়কের দখলে রয়েছে দুইটি করে লিগ শিরোপা।

তাঁরা হলেন – অ্যাডাম ভগস, ক্রিস গেইল ও গৌতম গম্ভীর। এখানে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন বিগ ব্যাশ লিগে পার্থ স্করচার্সদের দুইবার টুর্নামেন্ট সেরা বানানো অ্যাডাম ভগস। মোট ৩১টি ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়ে এখন পর্যন্ত ২১টিতেই জয়ের মুখ দেখেছেন তিনি। শুধু তাই নয়, বিগ ব্যাশে এখন পর্যন্ত তিনিই একমাত্র অধিনায়ক, যিনি একাধিক শিরোপা জয়ের সাক্ষী হয়েছেন। অন্যদিকে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের সেরা অধিনায়কদের তালিকায় তাঁর পরেই রয়েছেন ‘ইউনিভার্স বস’ ক্রিস গেইল। সিপিএলে জ্যামাইকা তালওয়াসকে দুইবার সোনালি ট্রফিটি পাইয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বিগ ব্যাশেও সিডনি থান্ডারকে দুইটি ম্যাচে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। দুই লিগ মিলিয়ে মোট ৭০টি ম্যাচে কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজির অধিনায়কত্ব করেছেন তিনি। যেখানে জয়ের শতকরা হার ৫৭.৩৫ শতাংশ।

তালিকার সপ্তম স্থানে রয়েছেন আইপিএলের দল কলকাতা নাইট রাইডার্সের সফলতম অধিনায়ক গৌতম গম্ভীর। এছাড়া ভারতের রাজধানী দিল্লিকে প্রতিনিধিত্ব করা দিল্লি ক্যাপিটালসকে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। সবমিলিয়ে দল দুইটিকে মোট ১০৪টি ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। যার মধ্যে ৬০টিতে জয় এবং ২টিতে ড্রয়ের দেখা পেলেও বাকিগুলোতে পরাজয় বরণ করে নিতে হয়েছে তাঁকে। কলকাতার এই মহারত্নের ম্যাচ প্রতি জয়ের হার ছিল ৫৬.৪৮ শতাংশ।

অন্তত একবার হলেও যাঁরা দলকে শিরোপা জিতিয়েছেন

সেরা পাঁচ ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের ৩৯ আসরে এই সাত অধিনায়কের হাতেই গেছে ২০টি শিরোপা। বাকি ১৯টি ট্রফিতে ছোঁয়া পড়েছে আলাদা আলাদা ১৯জন কাপ্তানের। সাফল্যের হার বিবেচনায় এনে তাঁদেরও একটি তালিকা দেখানো যায় এভাবে :-

১ | জেপি ডুমিনি (টুর্নামেন্ট – পিএসএল; সফলতা – ১০০%)

২ | ক্রিস হার্টলি (টুর্নামেন্ট বিবিএল; সফলতা – ৭৭.২৭%)

৩ | ইমরুল কায়েস (টুর্নামেন্ট – বিপিএল; সফলতা – ৭০.৫৮%)

৪ | ট্রাভিস হেড (টুর্নামেন্ট – বিবিএল; সফলতা – ৭০%)

৫ | স্টিভ স্মিথ (টুর্নামেন্ট – বিবিএল ; সফলতা – ৬৬.৬৬%)

৬ | সাইমন কাটিচ (টুর্নামেন্ট – বিবিএল; সফলতা – ৬২.৫০%)

৭ | আন্দ্রে রাসেল (টুর্নামেন্ট – বিপিএল; সফলতা – ৬১.৫৩%)

৮ | সাকিব আল হাসান (টুর্নামেন্ট – বিপিএল; সফলতা – ৬০.৯৩%)

৯ | মিসবাহ উল হক (টুর্নামেন্ট – পিএসএল; সফলতা – ৫৯.৬১%)

১০ | সরফরাজ আহমেদ (টুর্নামেন্ট – পিএসএল; সফলতা – ৫৮.৯%)

১১ | ড্যারেন সামি (টুর্নামেন্ট – পিএসএল; সফলতা – ৫৮.৮৯%)

১২ | ডেভিড ওয়ার্নার (টুর্নামেন্ট – আইপিএল; সফলতা – ৫৭.৭৮%)

১৩ | মইসেস হেনরিকস (টুর্নামেন্ট – বিবিএল; সফলতা – ৫৬.২৫%)

১৪ | শের্ন ওয়ার্ন (টুর্নামেন্ট – আইপিএল; সফলতা – ৫৪.৫৫%)

১৫ | অ্যারন ফিঞ্চ (টুর্নামেন্ট – বিবিএল; সফলতা – ৪৮.২১%)

১৬ | কায়রন পোলার্ড (টুর্নামেন্ট – সিপিএল; সফলতা – ৪৭.৭৯%)

১৭ | অ্যাডাম গিলক্রিস্ট (টুর্নামেন্ট – আইপিএল; সফলতা – ৪৫%)

১৮ | জেসন হোল্ডার (টুর্নামেন্ট – সিপিএল; সফলতা – ৩৯.১৩%)

১৯ | মাইক হাসি (টুর্নামেন্ট – বিবিএল; সফলতা – ৩৯.১৩%)

[বি:দ্র: প্রথম বন্ধনীর ভেতর কেবলমাত্র সেই টুর্নামেন্টের নামই দেওয়া হয়েছে, যেটিতে কোনো অধিনায়ক নেতৃত্ব দিয়ে জয়ের দেখা পেয়েছেন। এছাড়া অনেকে আরো একটি,দুইটি বা তিনটি টুর্নামেন্টেও কোনো না কোনো দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন যা এই তালিকায় দেখানো হয়নি।]

সংশ্লিষ্ট খবর

Leave a Comment