বাংলাদেশে আসা বিশ্বকাপ ট্রফি দাম, সোনার পরিমাণ ও কারা ছুঁয়ে দেখতে পারেন

‘দ্য ওয়ার্ল্ডস বিগেস্ট শো’ নামে খ্যাত বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে যেন মানুষের উন্মাদনার শেষ নেই। এই ট্রফিটি যে দেশ জিতে, সে দেশই বয়ে নিয়ে বেড়ায় পরবর্তী চার বছরের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের গৌরব। তবে আসরের আগে এই ট্রপি ঘুরে বেড়ায় বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। এর অংশ হিসেবে আজ ঢাকায় এসেছে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসল ট্রফি।

গত ১২ মে দুবাই থেকে কাতার বিশ্বকাপ সামনে রেখে কোকা-কোলার আয়োজনে ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফির বিশ্বভ্রমণের শুরু হয়। ৫৬টি দেশ ঘোরার পথে ফিফা বিশ্বকাপের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক কোকা-কোলার উদ্যোগে বাংলাদেশের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সহায়তায় বাংলাদেশে এসেছে ট্রফিটি।

আজ বুধবার পাকিস্তান থেকে বিশেষ বিমানে বেলা ১১টায় ঢাকায় পৌঁছেছে। এই ট্রফির সঙ্গী হয়ে বাংলাদেশে এসেছেন ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী দলের মিডফিল্ডার ক্রিস্টিয়ান কারেম্বু ও ফিফার সাত সদস্যের প্রতিনিধিদল। কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থায় ট্রফিটি রাখা হবে র‌্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেনে।

এটিই কিন্তু প্রথম বিশ্বকাপ ট্রফি নয় প্রথমেই জেনে রাখা ভালো এখন ফিফা বিশ্বকাপে যে ডিজাইনটি রয়েছে সেটি কিন্তু শুরু থেকে ছিল না। ১৯৩০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়নদের পুরস্কার হিসেবে দেওয়ার জন্য বানানো হয়েছিল অন্য এক ধরনের ট্রফি যার নাম ছিল ভিক্টরি ট্রফি।

এই ট্রফির ডিজাইনারের নাম ছিল নাইকি। আর গ্রিসের বিজয়ের দেবীর নাম ছিল নাইকি, এবং তারই চেহারার আকারে বানানো হয়েছিলো এই ট্রফিটি। ১৯৩০ সালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে উরুগুয়েই প্রথম জিতে নেয় এই ভিক্টরি ট্রফি।

এই ট্রফির সাথে একটি মজার ঘটনা আছে। ১৯৩৮ সালে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হবার সুবাদে ভিক্টরি ট্রফিটি ছিল ইতালির কাছে। কিন্তু তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল তাই তখনকার ফিফা প্রেসিডেন্ট ইতালির নাগরিক অতরনিও বারাসসি খুব সাবধানে এবং গোপনে ট্রফিটি রোম থেকে নিয়ে আসেন।

ট্রফিটি একটি জুতার বাক্সে করে নিজের শোবার ঘরের বিছানার নিচে ছোট একটি গর্ত করে সেখানে লুকিয়ে রাখেন, যাতে করে অ্যাডলফ হিটলার কিংবা নাৎসি বাহিনীর কেউ ট্রফিটিকে আত্নসাৎ না করতে পারে। এই ভিক্টরি ট্রফিকেই ১৯৪৬ সালে তখনকার ফিফার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জুলস রিমেটের প্রতি সম্মান রেখে নামকরণ হয় জুলেরিমে ট্রফি নামে।

১৯৬৬ সালের ২০শে মার্চ ওয়েস্ট মিনিস্টারের সেন্ট্রাল হলে একটি প্রদর্শনী থেকে এই জুলেরিমে ট্রফিটি কাকতালীয়ভাবে চুরি হয়ে যায়। অথচ তখন আর মাত্র চার মাস পরেই বিশ্বকাপ শুরু হবে হবে এমনই একটি আমেজ তৈরি হয়েছিল সারা ফুটবলবিশ্বে।

তবে সৌভাগ্যবশত চুরি হওয়ার ৭ দিন পরেই দক্ষিণ লন্ডনের একটি সাভারবান গার্ডেন থেকে কাগজে মোড়ানো অবস্থায় এই ট্রফিটি উদ্ধার করে পিকলস নামের একটি কুকুর। পরবর্তীতে জানা যায় স্টিভ ক্রুক তার কিছু সহচর নিয়ে ট্রফিটি চুরি করেছিল।

এরপর থেকে নিরাপত্তার স্বার্থে প্রদর্শনীতে প্রদর্শন করে রাখার প্রয়োজনে জুলে রিমে ট্রফির হুবহু নকল একটি ট্রফি তৈরি করে ফুটবল এসোসিয়েশন। নকল ট্রফিটি এখন ম্যানচেস্টারের একটি ফুটবল মিউজিয়ামে রয়েছে। এবং জুলেরিমে ট্রফি একেবারে নিজেদের করে নেয়ার একটি নিয়ম করে দেয়া হয়েছিল সেই সময়।

যদি কোনো দেশ তিনবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় তাহলে সেই ট্রফিটি তারা একেবারে নিজেদের করে নিতে পারবে। ১৯৭০ সালের মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ফুটবলের জাদুকর কালো মানিক পেলের অসাধারণ নৈপুণ্যে ইতালিকে ৪-১ গোলে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবাদে জুলেরিমে ট্রফিটি স্থায়ীভাবে নিজেদের করে নেয় ব্রাজিল।

চুরি হওয়ার পর আবার চুরি পরবর্তীতে ট্রফিটি ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওর ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের একটি কাঠের বাক্সে প্রদর্শনী হিসেবে রাখা হয়। যার ডিসপ্লে ছিল বুলেট প্রুফ গ্লাসের তৈরি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ১৯৮৩ সালের ১৯ শে ডিসেম্বরে আবারো ট্রফিটি চুরি হয়ে যায়।

ধারণা করা হয় ট্রফিটি চারজন মিলে চুরি করেছিল এবং শাবল দিয়ে এর গ্লাস ভেঙেছিল। পরবর্তীতে এ ট্রফিটি আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অনেকের মতে ট্রফিটি তাপ দিয়ে গলিয়ে ফেলা হয়েছিল এবং গলিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল।

২০১৫ সালে ট্রফিটির ছোট্ট এক টুকরো অংশ খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। পরবর্তীতে এ ট্রফিটিতে ১.৮ কেজি পরিমাণ সোনা ব্যবহার করে অরিজিনাল ট্রফিটির অবিকল নকল করে বানানো হয়েছিল। সেটি ব্রাজিলিয়ান বিদায়ী প্রেসিডেন্টের কাছে হস্তান্তর করা হয়। জুলে রিমে ট্রফিটি ২০১৪ সালে একটি ডকুমেন্টারিতে ব্যবহার করা হয়েছিল, যেটির নাম ছিল ট্রেস অফ দ্য রিমেট ট্রফি।

নতুন ট্রফির অদ্যোপান্ত এখন ঐতিহাসিক সেই জুলে রিমে ট্রফিটি আর নেই। ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপের জন্য সেইসময়কার জুলেরিমে ট্রফির বদলে অন্য আরেকটি ডিজাইনের ট্রফি চ্যাম্পিয়নদের দেওয়ার সম্মতি প্রকাশ করা হয়েছিল ফিফা থেকে। যার ফলে ভিন্ন ভিন্ন সাতটি দেশ থেকে বিভিন্ন ধরনের ডিজাইন নিয়েছিল ফিফা।

সবশেষে ইতালিয়ান শিল্পী সিলভিও গাজ্জানিকার ডিজাইনটিকে সর্বসম্মতিক্রমে ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের ট্রফি হিসেবে বেছে নেয়। এই ট্রফিটিকে ইতালির স্টাবিলিমেন্টো আর্টিস্টিকো বেরটোনি কোম্পানিতে তৈরি করা হয়েছিল। এই ট্রফিটিতে দেখতে পাওয়া যায় দুজন মানুষ পৃথিবীকে উঠিয়ে ধরে আছে।

বর্তমানে বিশ্বকাপের স্বর্ণালী ট্রফির আর্থিক মূল্য প্রায় ১ কোটি মার্কিন ডলার। এই দামের সোনা দিয়ে দু’জন মানুষকে আগাগোরা মুড়ে দেবার পরেও কিছু সোনা বাকি থাকবে! একটি ম্যালাকাইট ভিত্তির উপর এই ট্রফিটি নির্মিত। এর উচ্চতা ৩৬.৮ সেন্টিমিটার ও ওজন ৬.১ কেজি।

এতে ১৮ ক্যারেটের ৫ কেজি স্বর্ণ ব্যবহৃত হয়েছে। এর ম্যালাকাইটে তৈরি ভিত্তিমঞ্চের উচ্চতা ১৩ সেন্টিমিটার। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী ট্রফিটির শুধু আর্থিকমূল্যই দেড় লাখ মার্কিন ডলার। তবে এই ট্রফিটির আর্থিক মূল্যের বাহিরেও মূল্য রয়েছে। সব মিলিয়ে যা ১ কোটি ডলারের কম নয়।

১৯৭৪ সালে প্রথমবার প্রবর্তনের পর জয় করে নেয় পশ্চিম জার্মানি। এই ট্রফিটি সর্বাধিক তিনবার জিতেছে জার্মানি। আর্জেন্টিনা, ইতালি, ফ্রান্স আর ব্রাজিল জিতেছে দুইবার করে। স্পেন জিতেছে ১ বার। ট্রফিটির নিচের দিকে ১৯৭৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত যতগুলো দেশ বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল তাদের নাম খোদাই করা আছে।ফিফার কিছু নির্দিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা ছাড়া এই ট্রফি ছুঁয়ে দেখার ক্ষমতা অন্য কারো নেই

You May Also Like

About the Author: