জানা গেল টেষ্টে টাইগারদের সকল ম্যাচ হারার আসল রহস্য

বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তান প্রথম টেস্ট ৪৯ রানেই টাইগারদের প্রথম ৪ উইকেট নেই। টাইগারদের প্রথম চার ব্যাটসম্যান সাদমান ইসলাম,সাইফ হাসান,নাজমুল হোসেন শান্ত,মুমিনুল হক এর স্কোর যথাক্রমে ১৪,১৪,১৪,৬।

লিটন দাস এবং মুশফিকুর রহিমের ২০৬ রানের পার্টনারশিপ এর কারণে টাইগাররা এক ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পায়। তবে ভুল থেকে শিক্ষা না নিয়ে টাইগাররা বরং দ্বিতীয় ইনিংসে আবার সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করে। দ্বিতীয় ইনিংসে ও ২৫ রান তুলতেই টাইগারদের প্রথম চার ব্যাটসম্যান প্যাভিলিয়নে। ঢাকায় দ্বিতীয় টেস্টেও যথাক্রমে টাইগারদের top-order ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

প্রথম ইনিংসে ৩১ রানে ৪ উইকেট এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ২৫ রানে ৪ উইকেট হারায় টাইগাররা। সাকিব আল হাসানের ফিফটিতে বাংলাদেশ লড়াই করলেও শেষ পর্যন্ত টেস্ট ম্যাচটি রক্ষা করতে পারেনি। টপ অর্ডারের ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হওয়ার ফলাফল বাংলাদেশ নিজেদের মাটিতে পাকিস্তানের হাতে হোয়াইটওয়াশ। কিন্তু এমনটা বার বার হওয়ার কারণ কি ?মোটামুটি প্রতিটি টেস্ট সিরিজে বাংলাদেশের টপ অর্ডারের স্ট্রাগল চলছে।

এক তামিম ইকবাল ছাড়া ওপেনিং পজিশনে কেউ থিতু হতে পারছে না। সাদমান ইসলাম এবং সাইফ হাসান চরম রকমের অধারাবাহিক হলেও বাংলাদেশ টিম ম্যানেজমেন্ট এর কাছে যথেষ্ট বিকল্প না থাকায় দিনের পর দিন এদের সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এতে ক্ষতিটা হচ্ছে কার, দিনশেষে বাংলাদেশ দল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এবং ভেঙে যাচ্ছে হাজার টাইগার সমর্থকদের মন। সমর্থক হিসেবে আমার আপনার সবার প্রশ্ন করার অধিকার আছে কেন টেস্ট স্ট্যাটাস এর ২১ বছর পার হওয়ার পরও আমাদের কাছে যথেষ্ট বিকল্প খেলোয়াড় নেই?

টাইগারদের টেস্ট ধারাবাহিক ব্যর্থতা আমাদের দুর্বল ক্রিকেটীয় অবকাঠামোর দিকে স্পষ্ট ইঙ্গিত করে। অবকাঠামো এবং তৃণমূল নিয়ে কাজ করতে অনেক সময় লাগবে এবং আশা করা যায় সাময়িক পারফরম্যান্সের পর বিসিবি এগুলো নিয়ে কাজ করবে। কিন্তু আপাতত সমাধান কিভাবে হবে। টাইগারদের top-order যে ব্যর্থতার বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে এর থেকে বের হওয়ার উপায় কি?

আপাতত তামিম ইকবাল ছাড়া টেস্ট দলের জন্য নির্বাচকদের রাডারে ওপেনার আছে তিনজন সাইফ হাসান, সাদমান ইসলাম এবং অভিষিক্ত মাহমুদুল হাসান জয়। ওপেনার মাহমুদুল হাসান জয়ের সদ্য অভিষেক হওয়ায় তাকে নিয়ে ঘাটাঘাটি করা যুক্তিহীন। সুতরাং জয়কে একপাশে রেখে বাকি ওপেনারদের টেস্ট স্ট্যাটিস্টিক এর উপর একটু নজর দেওয়া যাক।

সাইফ হাসান এবং সাদমান ইসলাম উভয়ের টেস্ট গড় ৩০ এর নিচে। ওপেনার সাদমান এর ১০ ম্যাচে ২৭.৬১ গড়ে ২ ফিফটি এবং এক সেঞ্চুরি কিছুটা মানানসই হলেও। সাইফ হাসানের টেস্ট ক্যারিয়ার তার নামের সাথে একদমই মানানসই নয় ছয় ম্যাচে ১১ ইনিংসে ব্যাট করে গড় মাত্র ১৪.৪৫ এবং সর্বোচ্চ রান ৪৩।

এখন পর্যন্ত ফিফটি দেখা পায়নি এ ওপেনার। সামনের খেলা গুলো তে সাইফ এবং সাদমানের পারফরম্যান্সের উন্নতি যদি না হয় তাহলে তামিমের সঙ্গী হবেন কে। যথেষ্ট বিকল্প খেলোয়ার হাতে না থাকায় এবং ঘরোয়া লীগ যথেষ্ট মানসম্মত না হওয়ায় নির্বাচকরা এক ধরনের প্লেয়ার ক্রাইসিসে পড়েছেন। সম্প্রতি বিসিএলে মোহাম্মদ মিঠুন ১৭৬ রানের ইনিংস খেলার পর থেকে তাকে ওপেনিং স্লটে চিন্তা করা হচ্ছে। মিডিয়ার খবর অনুযায়ী কোচ রাসেল ডমিঙ্গোর পরামর্শ মিঠুন ওপেন করেন। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইঙ্গিত যে বাংলাদেশ টিম ম্যানেজমেন্ট এবং কোচ রাসেল ডমিঙ্গো মিঠুনকে টেস্ট ওপেনার হিসেবে বিবেচনা করছেন।

নিঃসন্দেহে মিঠুনের ১৭৬ রানের ইনিংসটি অসাধারণ ছিল এবং প্রথমবার ওপেনিংয়ে নেমে এত লম্বা সময় ব্যাটিং করে উনি যথেষ্ট টেম্পারমেন্ট শো করেছেন। তবে জাতীয় দলে ঢোকার জন্য কি মাত্র একটি ইনিংস যথেষ্ট অবশ্যই না। মোহাম্মদ মিঠুন যে দশটি টেস্ট খেলেছে সেখানে তেমন কোন বলার মতো পারফর্মেন্স না থাকলেও তার ফার্স্ট ক্লাস রেকর্ড মোটামুটি যথেষ্ট সমৃদ্ধ। ১১০ প্রথম শ্রেণীর ম্যাচে ৩৩.৭৯ গড় ৫৭১২ রান নামের পাশে ২৮ টি ফিফটি এবং ১৩ টি সেঞ্চুরি ইঙ্গিত করে যে বড় ইনিংস খেলার যথেষ্ট টেম্পারমেন্ট উনার মধ্যে রয়েছে।

তবে অধিকাংশ বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা চোখে পড়ে যে তারা ঘরোয়া প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে সফল হলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গিয়ে ব্যর্থতার জালে ঘুরপাক খেতে হয়। বলা যায় মিঠুনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিজের ঘরোয়া ক্রিকেটের ধারাবাহিক ফর্ম আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশ টেস্ট দলের এ প্লেয়ার ক্রাইসিস এর সময় মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত হতে পারে দারুণ কার্যকর।

প্রথম শ্রেণীর ম্যাচে ৬৬ ইনিংস ব্যাট করে অবিশ্বাস্য ৫৫.৯৮ গড়ে ব্যাট করে ৪৯৯৯ রান। এখন পর্যন্ত মাত্র তিনটি টেস্ট ম্যাচ খেলার সুযোগ পাওয়া মোসাদ্দেক আফগানিস্তানের বিপক্ষে তার সর্বশেষ ম্যাচেও ৪৮ রানের ইনিংস খেলেছেন । এরপর টিম ম্যানেজমেন্ট কেন তার প্রয়োজন বোধ করেনি বা কেন তাকে সুযোগ দেয়নি এ ব্যাপারে কারো জানা নেই।

এ ধরনের অসাধারণ প্রথম শ্রেণীর রেকর্ড থাকার পরেও মোসাদ্দেককে টেস্টের জন্য বিবেচনা না করে ওয়ানডের জন্য বিবেচনা করা হয়। এটাতে কোন সন্দেহ নেই যে টাইগারদের নির্বাচন প্রক্রিয়া যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ এবং টাইগারদের এ পারফরম্যান্সের পিছনে প্লেয়ারদের পাশাপাশি টিম ম্যানেজমেন্টের ও যথেষ্ট দায় রয়েছে।

নতুন বছরের শুরুতেই টাইগাররা নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট মিশনে নামবে। টিম ম্যানেজমেন্ট এবং কোচ রাসেল ডমিঙ্গোর হাতে খুব বেশি একটা সময় নেই নিজেদের ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার এবং পারফেক্ট টিম কম্বিনেশন দাঁড় করানোর। আশা করা যায় নতুন বছরে সবার সম্মিলিত চেষ্টায় দেশের ক্রিকেটের কালো মেঘ সরে যাবে এবং নতুন সূর্যের উদয় হবে।

আলমীর খান

You May Also Like