বড় ভাইয়ের সেই মহান দ্বায়িক্ত নিয়ে এবারের বিশ্বকাপেও ঝলক দেখাতে প্রস্তুত মোস্তাফিজুর রহমান

মাশরাফি বিন মর্তুজা নেই। তাকে ছাড়া এবারই প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলবে বাংলাদেশ। আগে যেমন মাশরাফি বাংলাদেশের পেস বোলিং লাইনআপের নেতৃত্ব দিতেন,

তার অনুপস্থিতিতে এবার সেই দায়িত্বটা এসে পড়েছে দেশসেরা পেসার মোস্তাফিজুর রহমানের কাঁধে।

ছয় বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার, তাতেই দেশ-বিদেশে কত যে সুনাম কুড়িয়েছেন দ্য ফিজ! ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপে আসরের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারির তালিকায় ২০ উইকেট নিয়ে ছিলেন চতুর্থ স্থানে।

বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ আইপিএলে নিজের প্রথম আসরেই ফিজ জাত চিনিয়েছিলেন নিজের। স্লোয়ার, কাটারে মুগ্ধ করেছিলেন গোটা বিশ্বকে।

ফ্র্যাঞ্চাইজি সানরাইজার্স হায়দরাবাদকে চ্যাম্পিয়ন করার নেপথ্যে থেকে পেয়েছিলেন উদীয়মান ক্রিকেটারের স্বীকৃতি। সেটাও আবার প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র বিদেশি ক্রিকেটার হিসেবে।

মোস্তাফিজুর রহমান, জন্ম: ৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৫, রোল: বোলার, বোলিং স্টাইল: বাঁহাতি মিডিয়াম ফাস্ট, ব্যাটিং স্টাইল: বাঁহাতি ব্যাটার, টি-টোয়েন্টি অভিষেক: এপ্রিল ২৪, ২০১৫ বনাম পাকিস্তান

সেই উদীয়মান ক্রিকেটার এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা বোলারদের একজন। প্রতিপক্ষ ব্যাটাররা তাকে নিয়ে বাড়তি পড়াশোনা না করে মাঠে নামেন না।

মাঝে এক কাঁধের চোটে পড়ে হারিয়েছিলেন ফর্ম, হারিয়েছিলেন ছন্দ। তবে চ্যাম্পিয়ন বোলাররা এত সহজে হারিয়ে যায় নাকি? মোস্তাফিজ ফিরেছেন। ফিরেছেন সমহিমায়।

আবার বলকে কথা বলাতে পারছেন নিজের মতো করে। দুর্বোধ্য কাটারে বোকা বানাচ্ছেন বিশ্বের বাঘা বাঘা সব ক্রিকেটারকে।

ক্রিকেটে বহুল প্রচলিত একটা প্রবাদ আছে, ফর্ম ইজ টেম্পোরারি, বাট ক্লাস ইজ পার্মানেন্ট। মোস্তাফিজের সঙ্গে এই প্রবাদটি বড়ই মানানসই। নিজের খারাপ সময়টাকে দূর করে নিজের ক্লাস আবার চিনিয়েছেন তিনি।

কিছুদিন আগে ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের মতো দলের বিপক্ষে ৯ ম্যাচ খেলে ফিজ পকেটে পুরেছিলেন ১৫ উইকেট। উইকেট নেয়ার সংখ্যাটা যদি মুগ্ধতা ছড়ায়, তবে তার ৬.১০ ইকোনমি রেট দেখলে তো চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার পালা। গড়টাও দুর্দান্ত – ৯.৮৩!

তবে এমন পারফরম্যান্সের পরও কথা উঠছিল। ঘরের মাঠের সুবিধা নিয়ে স্লো উইকেটের কারণেই নাকি মোস্তাফিজের ওই সাফল্য। বিশ্বকাপের উইকেট হবে ফ্ল্যাট। বোলার সুবিধা পাবেন না উইকেট থেকে।

মোস্তাফিজও তাই নাকি সুবিধা করতে পারবেন না আরব আমিরাত কিংবা ওমানের মাঠে। তবে সবার সেই ধারণা যে ভুল, এবারের আইপিএলের দ্বিতীয় অংশে তা প্রমাণ করেছেন বাংলাদেশের এই তারকা।

করোনার কারণে আইপিএলের দ্বিতীয় অংশ হয়েছে আরব আমিরাতে। সেখানকার ফ্ল্যাট উইকেটেও বল হাতে মোস্তাফিজ ছিলেন ফ্লুয়েন্ট। কাটার, স্লোয়ারে ব্যাটারদের পিচে ছড়ি ঘুরিয়েছেন নিজের মতো করে।

ফিজের দল রাজস্থান রয়্যালস পেরোতে পারেনি রাউন্ড রবিন লিগের গেরো। তবে মোস্তাফিজ ১৪ ম্যাচে ১৪ উইকেট পকেটে পুরেছেন। ৩১ গড়ে ৮ এর একটু ইকোনমি রেটে রাজস্থানের হয়ে সবকটি ম্যাচই খেলেছেন কাটার মাস্টার।

বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে তার টি-টোয়েন্টি রেকর্ডও বেশ ঈর্ষণীয়। ৫২ ম্যাচে অবিশ্বাস্য ১৮.৬৫ গড়ে তার উইকেট সংখ্যা ৭৬টি। ইকোনমি রেট মাত্র ৭.৪৮! ফরম্যাটটা যখন টি-টোয়েন্টি এই ইকোনমি রেট তো মাত্রই হবে।

তবে শুধু এই রেকর্ড মোস্তাফিজকে চেনাতে যথেষ্ট নয়। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে, পুরো বিশ্বকে নিজের বোলিং জাদুতে বুঁদ করে রেখেছিলেন ফিজ। রেকর্ডও গড়েছিলেন একের পর এক।

নিজের প্রথম বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই মোস্তাফিজ নিয়েছিলেন ৫ উইকেট। ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সেটাও আবার নিউজিল্যান্ডের মতো প্রতাপশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে।

সে বছর বল হাতে এই ফরম্যাটটায় অতিমানবীয় পারফরম্যান্সই করেছিলেন। জাতীয় দল ও আইপিএলে খেলা ২৪ ম্যাচে নিয়েছিলেন ৩৩ উইকেট। সেটাও মাত্র সাড়ে ৬ ইকোনমিতে।

২০১৮ সালে বাংলাদেশিদের পক্ষে দ্রুততম ৫০ টি-টোয়েন্টি উইকেট শিকারের কীর্তি গড়েন মোস্তাফিজ। বিশ্বের বাকি সমস্ত পেসারদের মধ্যেও দ্রুততম।

এর আগে ২০১৬ সালে কত কীর্তি যে তার নামে লেখা হয়েছে। আইপিএলে উদীয়মান খেলোয়াড়ের পুরষ্কার পাওয়া ছাড়াও সে বছর এই ফরম্যাটে আইসিসিরও সেরা উদীয়মান খেলোয়াড় নির্বাচিত হন ফিজ।

প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এই কীর্তি গড়েন তিনি। এরপর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অনবদ্য পারফরম্যান্স করে পান টুর্নামেন্ট সেরা দলের দ্বাদশ খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি।

ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে এত এত সাফল্য পেয়ে মোস্তাফিজ নিজের চেষ্টা, পরিশ্রম কমাননি কখনো। মাঝের ওই চোট অনেক ভুগিয়েছিল এটা সত্যি। তাতে পারফরম্যান্সেও পড়েছিল ভাটা।

কিন্তু চ্যাম্পিয়ন বোলাররা এরকম কণ্টকাকীর্ণ চ্যালেঞ্জ জিততে ভালোবাসেন। যেভাবে ভালোবেসে জিতেছেন ফিজ।

সংশ্লিষ্ট খবর