সাকিব সম্ভবত প্লে–অফের পরিকল্পনায় নেই দেখুন বিস্তারিত

আইপিএলের প্লে–অফে খেলা মোটামুটি নিশ্চিত কলকাতা নাইট রাইডার্সের। ১৪ ম্যাচে ১৪ পয়েন্ট এবং ০.৫৯৮ নেট রানরেট নিয়ে টেবিলের চারে এউইন মরগানের দল।

পাঁচে থাকা পাঞ্জাব কিংসের আর ম্যাচ নেই, তাই কলকাতাকে ধরার সম্ভাবনা নেই দলটির। ছয়ে থাকা মুম্বাই ইন্ডিয়ানসকে নিয়েও না ভাবলে চলছে কলকাতার। নেট রানরেটে কলকাতার চেয়ে বিস্তর ব্যবধানে পিছিয়ে মুম্বাই (–০.০৪৮)।

এ সমীকরণ বিচারে কলকাতার কোনো ভাবনা নেই বললেই চলে। প্লে–অফ সামনে রেখে কলকাতার এখন ভাবনার বিষয় হতে পারেন সাকিব আল হাসান না আন্দ্রে রাসেল?

প্লে–অফে এ দুই অলরাউন্ডারের মধ্যে কাকে খেলানো উচিত, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এরই মধ্যে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে কাল রাজস্থান রয়্যালসের বিপক্ষে সাকিবকে কলকাতা যে কায়দায় খেলিয়েছে, তাতে অনেকেরই সন্দেহ প্লে–অফে কলকাতা বুঝি রাসেলকেই দলে ফিরিয়ে আনবে!

কলকাতা অধিনায়ক মরগান এ ম্যাচে সাকিবকে যেভাবে ব্যবহার করেছেন, তাতে সন্দেহটা একেবারে অমূলক কিছু নয়।

আগে ব্যাট করে ৪ উইকেটে ১৭১ রান তুলেছিল কলকাতা। এ পুঁজি রক্ষার লড়াইয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি দলটি প্রথম (ওভারের) পরীক্ষায় নামিয়ে দেয় সাকিবকে। মরগানের এ আস্থার দারুণ প্রতিদানও দিয়েছেন বাংলাদেশ অলরাউন্ডার।


মাত্র ১ রান দিয়ে তুলে নেন যশস্বী জয়সোয়ালকে। দলকে দারুণ শুরু এনে দেওয়ায় খুব স্বাভাবিকভাবেই সাকিব–ভক্তরা ভেবেছেন, তাঁকে রাজস্থানের ইনিংসের মাঝে ও শেষেও ব্যবহার করা হবে, যেহেতু শুরুটা ভালো করেছেন এবং ইনিংসের এসব পর্যায়ের বল করাও সাকিবের জন্য নতুন কিছু নয়।

কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। অবিশ্বাস্যভাবে মরগান সাকিবকে আর ব্যবহার করেননি। ওদিকে সুনীল নারাইন ৪ ওভারে ৩০ রান দিয়ে উইকেটশূন্য। নিজের দ্বিতীয় ওভারে দুটো ছক্কা এবং তৃতীয় ওভারেও একটি ছক্কা হজম করেন ক্যারিবিয়ান স্পিনার। রাসেল চোটে পড়ার আগে এই নারাইনের কাছেই কলকাতা একাদশে জায়গা হারিয়েছিলেন সাকিব।

কিন্তু রাসেল চোটে পড়ার পর সাকিব তাঁর জায়গায় সুযোগ পেয়ে ক্যারিবিয়ান অলরাউন্ডারের অভাবটা যে মোটেও বুঝতে দেননি, জয়ের পর সে কথা স্বীকারও করেন মরগান,

‘সাকিব শেষ দুই ম্যাচে যেভাবে পারফর্ম করেছে, তাতে রাসেলের শূন্যতা পূরণ সহজ হয়েছে। সে দারুণ পারফর্ম করেছে। এদিকে রাসেল ফিরে আসার জন্য অবিশ্বাস্যরকম চেষ্টা করছে। তার অগ্রগতি আমরা প্রতিদিন খেয়াল রাখছি।’

মরগান সাকিবের প্রশংসা করলেও তাঁর কথায় একটি বিষয় আঁচ করা যায়, সাকিবের পারফরম্যান্স যত ভালোই হোক না কেন, রাসেল ফিট হলেই তাঁকে জায়গা ছাড়তে হবে। কাল রাজস্থানের বিপক্ষে ম্যাচে মরগান তাঁর বোলারদের যেভাবে ব্যবহার করেছেন, তা দেখে সাকিবের সমর্থকেরা এমন আঁচ করে নিতে পারেন। কীভাবে?

সাকিব ছাড়া আরও চার বোলার ব্যবহার করেন মরগান—শিভম মাভি, সুনীল নারাইন, লকি ফার্গুসন ও বরুণ চক্রবর্তী। দুজন স্পিনার ও বাকি দুজন পেসার। এবার আইপিএলে এ চার বোলারকে নিয়মিত ব্যবহার করছেন কলকাতা অধিনায়ক। কালও নারাইন, ফার্গুসন ও বরুণকে তাঁদের ৪ ওভারের কোটা পূরণ করিয়েছেন মরগান।

মাত্র ৮৫ রানে অলআউট হওয়া রাজস্থান ১৭তম ওভারের প্রথম বলে শেষ উইকেট না হারালে শিভম মাভির ৪ ওভারের কোটাও (৩.১ ওভার) পূরণ হতো।

অর্থাৎ সামনে যেহেতু প্লে–অফ, মরগান সম্ভবত চেয়েছেন দলের নিয়মিত বোলারদের পর্যাপ্ত ম্যাচ অনুশীলনের সুযোগ করে দিতে। সাকিব সম্ভবত প্লে– অফের পরিকল্পনায় নেই বলেই তাঁকে পরে আর বোলিংয়ে ফেরানোর প্রয়োজন মনে করেননি মরগান।

কেননা রাসেল ফিট হলেই যেহেতু সাকিবকে জায়গা ছেড়ে দিতে হবে, তাই বাকি বোলাররা মিলে জয় মোটামুটি নিশ্চিত করে ফেলার পর সাকিবকে ফেরানোর কোনো যুক্তি থাকে না। আর কে না জানে, প্লে–অফের মতো বড় মঞ্চে অলরাউন্ডার হিসেবে রাসেল সব সময়ই কলকাতার প্রথম পছন্দ, পরীক্ষিত খেলোয়াড়।

নিজের দিনে প্রায় অসম্ভব লক্ষ্যও ছোট হয়ে আসে রাসেলের ব্যাটের ঝলকানিতে। ১৫০ স্ট্রাইক রেট ধরে রেখে অবিশ্বাস্য ইনিংস খেলতে পারেন। এর সঙ্গে তাঁর কার্যকর পেস বোলিং তো আছেই।

রাসেলের সঙ্গে তুলনায় সাকিবকে অন্তত ব্যাটিংয়ে স্ট্রাইক রেটে অনেকেই পিছিয়ে রাখবেন। আর সাকিবের ব্যাটিংয়ের যে ধরন, কলকাতায় তেমন ব্যাটসম্যানের অভাব নেই। কিন্তু টি–টোয়েন্টিতে রাসেল যে ইনিংসটা খেলতে পারেন, খুব বেশি ক্রিকেটারের যে সেই সামর্থ্য নেই, তা প্রমাণিত।

আবুধাবিতে চেন্নাই সুপার কিংসের বিপক্ষে ম্যাচে চোট পান রাসেল। আইপিএলে এবার ১০ ম্যাচে ১১ উইকেট নিলেও ওভারপ্রতি গড়ে রান দিয়েছেন ৯.৮৯।

অন্যদিকে সাকিব ৫ ম্যাচে ৪ উইকেট নিলেও কিপটেমিতে রাসেলের চেয়ে এগিয়ে। ৬.৮০ গড়ে ওভারপ্রতি রান দিয়েছেন। ৫ ম্যাচে ১২.৬৬ গড়ে তাঁর রান ৩৮, স্ট্রাইক রেট ৯৭.৪৩। রাসেল আবার এখানে এগিয়ে। ১০ ম্যাচে ২৬.১৪ গড়ে ১৮৩ রান করেছেন ১৫২.৫০ স্ট্রাইক রেটে।

অর্থাৎ প্লে–অফে কলকাতা একাদশে সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্তত ব্যাটিং এবং একাই ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতা এগিয়ে রাখছে রাসেলকে।

তবে কলকাতাকে দুবার আইপিএল জেতানো সাবেক অধিনায়ক গৌতম গম্ভীরের এ নিয়ে একটি পর্যবেক্ষণ আছে। তাঁর মতে, দল থেকে বাদ পড়ার মতো পারফরম্যান্স করেননি সাকিব।

আর প্লে–অফে খণ্ডকালীন বোলারদের ওপর কলকাতার নির্ভরতা কপাল পোড়াতে পারে। অতিরিক্ত একজন বোলার খেলানোটা বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে।

গম্ভীরের কথায় সাকিবকে প্লে–অফে খেলানোর দাবিটা বেশ পরিষ্কার। সেটি একটি শর্ত দিয়ে খোলাসা করেই বলেছেন ভারতের সাবেক এ ওপেনার, প্লে–অফে রাসেল বল না করলে তাঁকে একাদশে রাখাটা ঠিক হবে না।

ক্রিকইনফোকে গম্ভীর বলেছেন তাঁর নিজের ভাবনা, ‘সে (রাসেল) বল না করলে দলে জায়গা পায় না। সাকিব কী ভুল করেছে? রাসেল ফিট থাকলে এবং দুই বিভাগেই (ব্যাটিং ও বোলিং) পারফর্ম করতে চাইলে তাকে দলে নিতাম আমি।

কিন্তু সে যদি শুধু ব্যাট করতে চায়, তাহলে আমি সাকিবকে নিতাম। কারণ, আরসিবির মতো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ৬ নম্বর বোলারের দরকার হয়। মাত্র চার–পাঁচজন বোলার নিয়ে এবং নীতিশ রানা ও ভেঙ্কটেশ আইয়ারের মতো খণ্ডকালীন বোলার দিয়ে সব সময় কাজ চলে না। এতে বিপদের ঝুঁকি থাকে বেশি, প্লে–অফের মতো জায়গায় এ ঝুঁকি কেউ নিতে চায় না।’

কলকাতা কাগজে–কলমে এখনো প্লে–অফে ওঠেনি। তবে এ নিয়ে কোনো ঝুঁকিও নেই। প্লে–অফে মরগানদের প্রতিপক্ষ এখনো নিশ্চিত হয়নি। গম্ভীর আরসিবির (রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু) উদাহরণ দিয়েছেন ব্যাটিং গভীরতা আছে এমন দলের মুখোমুখি হয়ে সম্ভাব্য সংকট বোঝাতে।

অতিরিক্ত বোলার হিসেবে প্লে–অফে সাকিবকে খেলানো হলে কলকাতা একজন ব্যাটসম্যানও পাচ্ছে। কিন্তু কলকাতা কী এভাবে ভাববে?

তা সময়ই বলে দেবে।

You May Also Like

About the Author: